শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় একদিনে তিনটি পৃথক স্থান থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বেড়েছে। এর আগে উপজেলার বরমী ইউনিয়নে দুই দিনের ব্যবধানে সংঘটিত দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুক্রবার (১২ জুন) তিনটি পৃথক স্থান থেকে তিনজনের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সকালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের এমসি বাজার এলাকার একটি ময়লার ভাগাড় থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে মাওনা হাইওয়ে থানা পুলিশ। স্থানীয়দের ধারণা, দুর্বৃত্তরা যুবককে অন্য কোথাও হত্যা করে রাতের কোনো এক সময় সেখানে মরদেহ ফেলে রেখে যায়। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই দিন দুপুরে মাওনা চৌরাস্তা উড়ালসেতুর নিচে পুলিশ বক্সসংলগ্ন খোলা জায়গা থেকে শিখা রানী (৫০) নামে এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি উপজেলার গোসিঙ্গা ইউনিয়নের বেড়াবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভবঘুরে জীবনযাপন করছিলেন।
দিনের শেষ ভাগে রাত ৮টার দিকে শ্রীপুর পৌরসভার বেড়াইদেরচালা এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে পাভেল আহমেদ রবিন (২৬) নামে এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করে শ্রীপুর থানা পুলিশ। তিনি নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার প্রেমনগর এলাকার বাসিন্দা। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক কলহের বিষয়টি সামনে এসেছে। প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার আগে এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে রাজি নয় পুলিশ।
বাড়ছে উদ্বেগ
চলতি বছরজুড়ে শ্রীপুরে হত্যা, আত্মহত্যা, অস্বাভাবিক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয়দের মতে, প্রায় ৬ লাখ স্থায়ী বাসিন্দার পাশাপাশি বিভিন্ন শিল্পকারখানায় কর্মরত আরও প্রায় ২২ লাখ শ্রমিক ও কর্মজীবী মানুষের চলাচল রয়েছে এ উপজেলায়। বিশাল এই জনবসতির এলাকায় ঘন ঘন অপরাধ, অস্বাভাবিক মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, একদিনে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। তা না হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে।
তাদের মতে, শিল্পাঞ্চলকেন্দ্রিক অপরাধ, মাদক বিস্তার, ছিনতাই, শ্রমিক অসন্তোষ, সামাজিক অস্থিরতা এবং জননিরাপত্তার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ২০২৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত শ্রীপুরে কতটি হত্যাকাণ্ড, আত্মহত্যা, অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। একই সঙ্গে এসব ঘটনার মধ্যে কতগুলোর রহস্য উদঘাটিত হয়েছে এবং কতগুলো মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে, সেই তথ্যও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, “শ্রীপুর একটি দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পাঞ্চল। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস ও কর্মসংস্থান রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, আত্মহত্যা ও মরদেহ উদ্ধারের ধারাবাহিক ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটন করা জরুরি। পাশাপাশি অপরাধ প্রবণতার কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে মানুষের নিরাপত্তাবোধ আরও শক্তিশালী হয়।”
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, “প্রতিটি ঘটনা পৃথকভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কোনো ঘটনায় অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অজ্ঞাত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং পুলিশ নিয়মিত টহল ও নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিনে তিনটি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নাকি বৃহত্তর কোনো সামাজিক ও আইন-শৃঙ্খলাজনিত সংকেত সেটি অনুসন্ধান করে প্রকৃত চিত্র সামনে আনা এখন প্রশাসনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
শ্রীপুর(গাজীপুর)প্রতিনিধি:
