নিউজ ডেস্ক :
ইরানের অগভীর উপকূলভাগ থেকে ২০ মাইলেরও কম দূরত্বে পারস্য উপসাগরের বুকে জেগে আছে শক্ত প্রবাল প্রাচীরে গঠিত একটি দ্বীপ। প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ৫ মাইল দীর্ঘ এই ভৌগোলিক প্ল্যাটফর্মটি একটি বিশেষ কাজের জন্য অত্যন্ত উপযুক্ত—তা হলো তেল রপ্তানি।
এটিই হলো খারগ দ্বীপ, যা চলমান ইরান যুদ্ধে একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন হুমকি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘খুব নিকট ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে আমরা খারগ দ্বীপসহ তাদের অন্যান্য তেল অবকাঠামোগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেব। ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেল ও গ্যাস বাজারেরও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমরা নিজেদের হাতে তুলে নেব।’
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘আমার পছন্দ সবসময়ই খারগ দ্বীপ দখল করা।’ তবে মার্কিন জনগণের মানসিক প্রস্তুতির ব্যাপারে কিছুটা সংশয় প্রকাশ করে তিনি যোগ করেন, ‘সত্যি বলতে আমি জানি না আমেরিকার এই ধকল নেওয়ার মতো মানসিকতা আছে কিনা। তবে এটি করতে পারলে বিপুল অর্থ ভাগ্য তৈরি হবে।’
খারগ দ্বীপ আসলে কী?
ইরানের মূল ভূখণ্ডের বেশিরভাগ উপকূলীয় অঞ্চল অত্যন্ত অগভীর হওয়ায় সেখানে বড় আকারের ‘সুপারট্যাঙ্কার’ (তেলবাহী জাহাজ) ভিড়তে পারে না। এই সমস্যার সমাধানে ইরান সমুদ্রের তলদেশ দিয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে তাদের উৎপাদিত প্রায় সব অপরিশোধিত তেল এই খারগ দ্বীপে নিয়ে আসে।
পারস্য উপসাগরের এই পাথুরে দ্বীপটি বাইরে থেকে রুক্ষ মনে হলেও ভেতরটা বেশ উর্বর। এখানে মিঠা পানির ঝরনা এবং খেজুরের বাগান রয়েছে, যা উপসাগরীয় দ্বীপগুলোর ক্ষেত্রে বেশ বিরল।
এছাড়া দ্বীপটির আরও ইতিহাস রয়েছে। কোনো এক সময় ইরানের রাজতন্ত্র এই দ্বীপটিকে রাজনৈতিক বন্দিদের নির্বাসন দেওয়ার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করত। দ্বীপে ২৪০০ বছরের পুরোনো পাথুরে খোদাই ও গুহা-সমাধিসহ ওলন্দাজ (ডাচ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তৈরি একটি ১৮ শতকের দুর্গ রয়েছে।
১৯৫০-এর দশকে এটিকে একটি বিশাল তেল শিল্পাঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়। বর্তমানে এখানে অন্তত ৮ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই তেল শোধনাগারের কর্মী।
উল্লেখ্য, সাধারণ মানুষের জন্য এই দ্বীপে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় একে ‘নিষিদ্ধ দ্বীপ’ বলা হয়। তবে স্যাটেলাইট চিত্রে এখানে সারি সারি তেল মজুত রাখার ট্যাংক, পাইপলাইনের জাল এবং বিশাল সব ঘাট দেখা যায়। সাধারণ পরিস্থিতিতে এখান থেকেই সুপারট্যাঙ্কারগুলো বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে—বিশেষ করে চীনে তেল পরিবহন করে।
কেন এই দ্বীপের গুরুত্ব এত বেশি?
এই দ্বীপটিকে ইরানের অর্থনীতির ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা বলা চলে। কারণ ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯০ শতাংশেরও বেশি এককভাবে এই খারগ দ্বীপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।
মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই দ্বীপটি দখল করতে পারলে ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করা যাবে এবং আলোচনার টেবিলে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থাকবে। ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক ‘গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরাম’-এর নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফার জানান, খারগ দ্বীপ আক্রান্ত হলে তেহরান অত্যন্ত মারাত্মক ও তীব্র পাল্টা আঘাত হানবে। তারা পারস্য উপসাগরে মোতায়েন মার্কিন সেনা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
স্থল অভিযানের সামরিক ঝুঁকি
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে, মার্কিন বাহিনী খারগ দ্বীপের সামরিক লক্ষ্যবস্তু যেমন—বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নৌঘাঁটি এবং মাইন মজুত রাখার ঘাঁটিতে বোমা হামলা চালিয়েছিল। তবে সে সময় তেলের মূল অবকাঠামোগুলো অক্ষত রাখা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আকাশপথের চেয়ে স্থলপথে এই দ্বীপ আক্রমণ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং বিপর্যয়কর হতে পারে। এর প্রধান কারণগুলো হলো—
১. মূল ভূখণ্ডের নিকটবর্তী অবস্থান: দ্বীপটি ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২০ মাইল দূরে অবস্থিত। ফলে এটি অনায়াসেই ইরানের রকেট, কামান (আর্টিলারি) এবং ড্রোন হামলার সীমানার মধ্যে পড়ে।
২. যোগাযোগ ও সুরক্ষার অভাব: পারস্য উপসাগরের অনেক গভীরে অবস্থান হওয়ায় মার্কিন নৌবাহিনীর যেকোনো বহরের সেখানে পৌঁছাতে অন্তত একদিন সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যে ইরান চারপাশের জলসীমায় মাইন পুঁতে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে ফেলতে পারবে।
৩. রসদ সরবরাহের চ্যালেঞ্জ: ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইউএস-ইরান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ক্রিশ্চিয়ান এমেরি সতর্ক করে বলেন, মার্কিন বাহিনী যদি কোনোভাবে দ্বীপটি দখলও করে, তবে সেখানে অবস্থান ধরে রাখা চরম কঠিন হবে। মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে হওয়ায় মার্কিন রসদ সরবরাহকারী জাহাজ ও বিমানগুলো অনবরত ইরানি ড্রোন ও মিসাইল হামলার মুখে পড়বে।
চূড়ান্ত বিচারে অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করছেন, ট্রাম্প যদি এই দ্বীপটি দখলের জুয়া খেলেন, তবে সেটি একটি অত্যন্ত বিপর্যয়কর সিদ্ধান্ত হবে—যা এই যুদ্ধকে মাসের পর মাস টেনে নিয়ে যাবে।
