আজ থেকে ঠিক ২০০ বছর আগের কথা। ১৮২৬ সালের এক সাধারণ দিন।অসাবধানতাবশত ঘটে যাওয়া একটি ছোট ভুলই বদলে দিয়েছিল মানবজাতির ইতিহাস। অবসান ঘটেছিল আগুন জ্বালানোর আদিম ও কষ্টসাধ্য যুগের। আবিষ্কার হয়েছিল আধুনিক দিয়াশলাই বা ম্যাচ, যা মানুষের আলো ও তাপ তৈরির পদ্ধতিকে চিরতরে পরিবর্তন করে দেয়।
রসায়নাগারে অসতর্ক মুহূর্তের সেই ‘ভুল’ কিভাবে মানবসভ্যতার জন্য এক মহাসৌভাগ্য হয়ে এলো, তা যেন রূপকথাকেও হার মানায়।উদ্ভাবক জন ওয়াকার ছিলেন একজন ইংরেজ ফার্মাসিস্ট। ১৭৮১ সালে ইংল্যান্ডের ডারহামের বন্দরনগরী স্টকটন-অন-টিস-এ তার জন্ম। শিল্প বিপ্লবের চরম মুহূর্তে বেড়ে ওঠা ওয়াকার প্রথমে সার্জন হিসেবে প্রশিক্ষণ নিলেও, তৎকালীন অপারেশন থিয়েটারের রক্তাক্ত পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে পেশা বদলে ‘ড্রাগিস্ট’ বা ওষুধ বিক্রেতা হন। মানুষের পাশাপাশি গৃহপালিত পশুর ওষুধ তৈরি করতেন।
একই সঙ্গে রাসায়নিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা ছিল তার নেশা।
১৮২৬ সালের কোনো এক দিনে ওয়াকার তার গবেষণাগারে বিস্ফোরক তৈরির জন্য একটি রাসায়নিক মিশ্রণ তৈরি করছিলেন। মিশ্রণটি নাড়ানোর পর কাঠের ছোট কাঠিটি তিনি চুল্লির পাশে শুকোতে দেন। পরে কাঠিটি পরিষ্কার করার জন্য ফায়ারপ্লেসের সামনে একটি পাথরে অনিচ্ছাকৃতভাবে আঘাত বা ঘষা লাগলে অলৌকিকভাবে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে।
ইতিহাসে এর আগে এই কাণ্ড কেউ দেখেনি।ওয়াকার তাৎক্ষণিকভাবে এই ঘটনার বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বুঝতে পারেন। তিনি এই কাঠির নাম দেন ‘ফ্রিকশন ম্যাচেস’ বা ‘ফ্রিকশন লাইটস’। ১৮২৭ সালের এপ্রিল মাসে এটি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে বাজারে বিক্রি শুরু হয়।
ওয়াকারের তৈরি সেই আদি দেশলাই ছিল মূলত খুব পাতলা ও চ্যাপ্টা কাঠের টুকরো। এর একপ্রান্তে পটাশিয়াম ক্লোরেট, অ্যান্টিমনি সালফাইড এবং আঠা হিসেবে ‘গাম অ্যারাবিক’ ও পানির মিশ্রণ লাগানো থাকত। ভাঁজ করা স্যান্ডপেপার বা শিরিষ-কাগজে ঘষা দিলেই এটি জ্বলে উঠত। শুরুতে এগুলো টিনের কৌটায় একশোটি করে ভরে বিক্রি করা হতো।
তবে ওয়াকারের এই দেশলাই পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। জ্বলন্ত সালফারের আস্তরণ অনেক সময় কাঠি থেকে ছিটকে মেঝেতে বা ব্যবহারকারীর পোশাকে পড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করত।জন ওয়াকার একজন প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। তিনি তার এই জাদুকরী সূত্রটি গোপন রাখলেও কখনো পেটেন্ট করেননি। ফলে খুব দ্রুতই অন্যরা এই সূত্র উন্নত করার সুযোগ পায়। ১৮২৯ সালে লন্ডনের স্যামুয়েল জোন্স ওয়াকারের দেশলাইয়ের হুবহু অনুকরণে ‘লুসিফার’ নামে ম্যাচ বাজারে এনে ব্যাপক উৎপাদন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৮৪৪ সালে একটি সুইডিশ সংস্করণ আধুনিক দেশলাই বাক্সকে বৈশ্বিক জনপ্রিয়তায় রূপ দেয়, যা প্রথম পেটেন্ট করা দেশলাই বাক্স ছিল।
শিল্প বিপ্লবের সেই যুগে বাষ্পীয় ইঞ্জিন ও ট্রেনের আবিষ্কার গতি এনে দিলেও, ইঞ্জিনে আগুন জ্বলাতে মানুষকে তখনও চকমকি পাথর-ইস্পাত ব্যবহার করতে হতো বা কয়লা জ্বালিয়ে রাখতে হতো। দিয়াশলাইয়ের আবিষ্কার সেই কষ্ট দূর করে শিল্পক্ষেত্র ও গৃহস্থালিতে বিপ্লব নিয়ে আসে।
পরবর্তীতে এটি একটি বিশাল গৃহভিত্তিক শিল্পে রূপ নেয়। কারখানা সংলগ্ন এলাকার দরিদ্র নারী ও শিশুরা ঘরে বসে বাক্স তৈরি করে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ পায়। যন্ত্রপাতি আসার পর এটি শতকোটি ডলারের বৈশ্বিক ব্যবসায় পরিণত হয়।
পরবর্তী সময়ে সিগারেট লাইটারের আবিষ্কার দিয়াশলাই শিল্পে বড় ধরনের ধস নামায়। বিশ্বজুড়ে অনেক ঐতিহ্যবাহী ম্যাচ ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। তবে আজও দেশলাইয়ের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। সাধারণ গৃহস্থালি ব্যবহারের পাশাপাশি এটি এখন একটি ফ্যাশন উপকরণেও পরিণত হয়েছে। বর্তমানে কাস্টমাইজড বা শৌখিন দিয়াশলাই প্যাকের দাম ২৫০ ডলার (প্রায় ৩০ হাজার টাকা) পর্যন্ত হয়ে থাকে।
