বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এক ক্ল্যাসিক দ্বৈরথের রোমাঞ্চ ছুঁয়ে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বকে। লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে দেখা হচ্ছে দুই ইউরোপিয়ান জায়ান্ট স্পেন ও বেলজিয়াম। লুইস দে লা ফুয়েন্তের ইস্পাতকঠিন রক্ষণে ইতিহাস গড়তে চাওয়া অপ্রতিরোধ্য ‘লা রোজা’ বাহিনী, বিপরীতে রুডি গার্সিয়ার কোচিংয়ে দিন দিন অপ্রতিরোধ্য গোলমেশিনে রূপ নেওয়া ‘রেড ডেভিলস’।
একদিকে রয়েছে স্পেনের নিখুঁত ট্যাকটিকস আর কঠিন রক্ষণ, যা পুরো টুর্নামেন্টে এখনো কোনো প্রতিপক্ষ ভাঙতে পারেনি। অন্যদিকে টানা ১৮ ম্যাচে অপরাজিত থাকার অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় পা রাখছে বেলজিয়াম। স্প্যানিশ প্রাচীর গুঁড়িয়ে শেষ চারের টিকিট কাটতে মরিয়া তারা।
চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের যাত্রাটা রূপকথার মতো, বিশেষ করে তাদের রক্ষণের কারণে। গ্রুপ পর্বের বাধা অনায়াসে পার করার পর নকআউটের পরিপক্বতা দেখিয়েছে দে লা ফুয়েন্তের দল। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে অস্ট্রিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর, শেষ ষোলোতে পর্তুগালকে ১-০ গোলে স্তব্ধ করে দেয় তারা।
খেলা শেষের ঠিক আগমুহূর্তে বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনোর গোলে জয় নিশ্চিত হয় স্পেনের। সবচেয়ে বড় কথা, চলতি বিশ্বকাপে এখনো কোনো গোল হজম করেনি স্পেন। গোলরক্ষক উনাই সিমন টানা ৬০৯ মিনিট জাল অক্ষত রেখে গড়েছেন নতুন টুর্নামেন্ট রেকর্ড।
বিপরীতে বেলজিয়ামের পথচলাটা ছিল আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রদর্শনী। মিশর ও ইরানের বিপক্ষে ড্র করে গ্রুপ পর্বে ধীরগতির শুরুর পর নিউ জিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে তারা।
নকআউটে এসে সেই ধার আরও বেড়েছে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো টাইট ম্যাচে সেনেগালকে ৩-২ গোলে হারানোর পর, শেষ ষোলোর ম্যাচে যৌথ আয়োজক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদেরই মাঠে ৪-১ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখে বেলজিয়াম।
হাইভোল্টেজ এই ম্যাচের আগে বেলজিয়ামে বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে মাঝমাঠের প্রধান ভরসা আমাদু ওনানার চোট। এসিএল চোটে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে গেছেন এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, যা বেলজিয়ামের মাঝমাঠে বড় শূন্যতা তৈরি করেছে। এ ছাড়া স্পোর্টিং ডিফেন্ডার জেনো দেবাস্টের ফিটনেস টেস্ট বাকি রয়েছে। তবে স্বস্তির খবর, কেভিন ডি ব্রুইনেকে এই ম্যাচে শুরু থেকেই সেন্ট্রাল রোলে দেখা যেতে পারে।
স্পেন অবশ্য চোটের দিক থেকে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামসের সামান্য চোট থাকলেও তিনি স্কোয়াডে ফিরছেন। তবে রাইট-ব্যাক পজিশনে কাকে খেলানো হবে, তা নিয়ে মধুর সমস্যায় আছেন কোচ। আগের ম্যাচে দারুণ রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্সের পর পেদ্রো পোরোর জায়গায় মার্কোস ইয়োরেন্তেকে শুরুর একাদশে দেখা যেতে পারে।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং গতি—এই দুইয়ের ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের ভাগ্য। স্পেনের মূল লক্ষ্য থাকবে রদ্রি, পেদ্রি ও দানি ওলমোদের দিয়ে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কবজায় রাখা এবং নিখুঁত পাসের পজেশনাল ফুটবল খেলা। ফর্মের তুঙ্গে থাকা ফরোয়ার্ড মিকেল ওয়ারজাবালকে বল জোগানোর দায়িত্ব থাকবে তাদের কাঁধে।
ওনানার অনুপস্থিতিতে বেলজিয়ামের ইউরি তিলেমানস ও নিকোলাস রাসকিনকে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি কাউন্টার অ্যাটাকে মনোযোগ দিতে হবে। স্পেনের হাই-ডিফেন্সিভ লাইনকে ফাঁকি দিতে ডি ব্রুইনের দূরদর্শী পাস এবং দুই প্রান্তে জেরেমি ডকু ও লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের গতিই হবে বেলজিয়ামের মূল অস্ত্র। সেই সঙ্গে বক্সের মধ্যে রোমেলু লুকাকুর শক্তি স্প্যানিশ ডিফেন্ডারদের কঠিন পরীক্ষা নেবে।
গত তিন ম্যাচে ১২ গোল করা বেলজিয়ামের আক্রমণভাগের সামনে স্পেনের ‘ক্লিন শিট’ ধরে রাখার রেকর্ড ভাঙার কঠিন চ্যালেঞ্জ। লস অ্যাঞ্জেলেসের রাত কার জন্য উৎসবের আর কার জন্য কান্নার, তা দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আরেকটু।
