জুন মাসের তৃতীয় রোববার পালিত হয় বাবা দিবস। আর ২১ জুন বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় বিশ্ব সংগীত দিবস। দুটি দিবস যখন একই সময়ে, তখন মনে পড়ে যায় বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের সেইসব বাবা-সন্তানের গল্প, যেখানে রক্তের সম্পর্কের সঙ্গে মিশে গেছে সুর, তাল আর ভালোবাসার উত্তরাধিকার।
সংগীত শুধু একটি শিল্প নয়; অনেক সময় এটি একটি পরিবারের ঐতিহ্যও। এক প্রজন্মের হাতে গড়ে ওঠা সেই ঐতিহ্য পরবর্তী প্রজন্মের কণ্ঠ, সুর কিংবা বাদ্যযন্ত্রে নতুন রূপ পায়। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এমন কয়েকটি বাবা-সন্তানের জুটি রয়েছে, যাদের গল্প আজও অনুপ্রেরণার।
ফেরদৌস ওয়াহিদ ও হাবিব ওয়াহিদ
বাংলাদেশের পপ সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ ফেরদৌস ওয়াহিদ এবং তার ছেলে হাবিব ওয়াহিদ সেই তালিকার প্রথম সারিতেই থাকবেন। একদিকে ফেরদৌস ওয়াহিদের দীর্ঘ সংগীতজীবনের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে হাবিবের আধুনিক সংগীতায়োজন ও নতুন প্রজন্মের রুচির সঙ্গে তাল মেলানো সুরসৃষ্টি—দুই প্রজন্মের এই মেলবন্ধন বাংলা গানে তৈরি করেছে এক অনন্য অধ্যায়। বাবার সঙ্গে হাবিবের করা ‘অবশেষে’ অ্যালবাম সেই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
খালিদ হাসান মিলু ও প্রতীক হাসান-প্রীতম হাসান
প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী খালিদ হাসান মিলুর ক্ষেত্রেও দেখা যায় একই উত্তরাধিকার। তার সন্তান প্রতীক হাসান ও প্রীতম হাসান আজ সংগীতাঙ্গনের পরিচিত নাম। বাবার স্নেহ, শিক্ষা ও সংগীতভাবনা তাদের শিল্পীজীবনের ভিত্তি হয়ে রয়েছে। নানা সময় বাবার জনপ্রিয় গান নতুন করে পরিবেশন করে তারা শ্রোতাদের ফিরিয়ে নিয়ে যান স্মৃতির অ্যালবামে।
আইয়ুব বাচ্চু ও আহনাফ তাজওয়ার
রক সংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চু এবং তার ছেলে আহনাফ তাজওয়ারের গল্পও কম আবেগের নয়। বাবার মতো গায়ক না হলেও গিটারের প্রতি ভালোবাসা উত্তরাধিকারসূত্রেই পেয়েছেন আহনাফ। বিভিন্ন সময় বাবার পাশে দাঁড়িয়ে গিটার বাজানোর স্মৃতি আজও সংগীতপ্রেমীদের মনে বিশেষ জায়গা করে আছে। আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পরও তার ব্যবহৃত গিটার আর সংগীতচর্চার ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন ছেলে। বিশেষ কোনো প্রোগ্রাম বা ইভেন্টে দক্ষতার সঙ্গে গিটার বাজিয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেছেন আইয়ুব পুত্র।
হায়দার হোসেন ও জেরিন তুবা হোসেন
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে বাবা-মেয়ের যুগলবন্দীর কথা উঠলে বরেণ্য সংগীতশিল্পী হায়দার হোসেন এবং তার মেয়ে জেরিন তুবা হোসেনের নাম বেশ প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। ‘তিরিশ বছর’, ‘ফাইস্যা গেছি’ কিংবা ‘গন্তব্য’ খ্যাত এই জীবনমুখী ও সমাজসচেতন এই সংগীতশিল্পীর প্রতিভার দারুণ এক ছাপ তার মেয়ের মাঝেও বিদ্যমান। বিভিন্ন সময় টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর বিশেষ সংগীতানুষ্ঠানে বাবা-মেয়েকে একসঙ্গে গান পরিবেশন করতে দেখা গেছে। হায়দার হোসেনের গানের যে ধারা রেখেছেন, জেরিনও বাবার সেই আদর্শকে ধারণ করে নিয়মিত সংগীতের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন।
আব্দুল জব্বার ও মিথুন জব্বার
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের উত্তরসূরি মিথুন জব্বারও সংগীতের মাধ্যমে বাবার স্মৃতিকে জীবন্ত রেখেছেন। মোহাম্মদ আবদুল জব্বার ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট মারা যান। আবদুল জব্বারের ইচ্ছা ছিল, পরিবারে একজন তার মতো শিল্পী হবে এবং গানের মাধ্যমে দেশের কথা বলবে। ছেলে মিথুন জব্বার অনেক বছর দেশের বাইরে ছিলেন এবং দেশে ফিরে প্রতিনিয়ত গানের চর্চা করে চলছেন।
বারীণ মজুমদার ও বাপ্পা মজুমদারবারীণ মজুমদার ছিলেন দেশের উচ্চাঙ্গ সংগীত জগতের একজন বড় সাধক, তাকে বলা হয় 'ওস্তাদ'। তার দুই সুযোগ্য সন্তান বাপ্পা মজুমদার দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে বাবার মতোই বড় অবদান রাখছেন। বিশেষ করে আধুনিক বাংলা গান নিয়ে বর্তমান সময়ের শ্রোতাদের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন বাপ্পা।
আলাউদ্দিন আলী ও আলিফ আলাউদ্দিন
আটবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি সুরকার ও সংগীত পরিচালক আলাউদ্দিন আলী এবং তার সুযোগ্য কন্যা কণ্ঠশিল্পী আলিফ আলাউদ্দিনের সুরের যাত্রাটি এ দেশের সংগীতাঙ্গনের এক অনুপ্রেরণার অধ্যায়। আলাউদ্দিন আলী তার সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারে এ দেশের চলচ্চিত্র ও আধুনিক গানকে দিয়েছেন হাজার হাজার কালজয়ী সুর, যা বাঙালির মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। বাবার সেই সুরের আকাশ ছুঁয়েই সংগীতাঙ্গনে পা রাখেন আলিফ আলাউদ্দিন। তবে বাবার ছায়ায় থেকেও প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে আধুনিক পপ এবং মেলো-রক ঘরানার গানে নিজের এক স্বতন্ত্র কণ্ঠশৈলী ও পরিচয় তৈরি করেছেন তিনি।
আলম খান ও আরমান খান
‘ওরে নীল দরিয়া’ বা ‘হায়রে মানুষ রঙীন ফানুস’-এর মতো অজস্র কালজয়ী গানের স্রষ্টা, সাতবারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত কিংবদন্তি গীতিকার ও সুরকার আলম খান। বাবার সেই সুরের ছায়ায় বড় হয়ে আরমান খানও বেছে নিয়েছেন সুরের ভুবনকেই। নাটকের জগতে প্লেব্যাক করেছেন অসংখ্য গান। বলে রাখা ভালো, তিনি শুধু আলম খানের পুত্রই নন, দেশের পপ সম্রাট আজম খানের ভাতিজাও তিনি; যাকে তিনি গুরুর মতো সম্মান করেন। বাবার নিষ্ঠা ও মেধাকে মনেপ্রাণে ধারণ করা আরমান স্মরণ করেন, তার এই সংগীতশিল্পী হওয়ার নেপথ্যে নিজেদের ঘরোয়া পরিবেশ ছিল সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা।
কমল দাশগুপ্ত ও হামিন আহমেদ-শাফিন আহমেদ
ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ভুবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কিংবদন্তি সুরস্রষ্টা কমল দাশগুপ্ত। তারই যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এ দেশের সংগীতাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন দুই ছেলে হামিন আহমেদ ও শাফিন আহমেদ। বাবার চিরায়ত ধ্রুপদী ও মেলোডি ঘরানার আবহে বড় হলেও এই দুই ভাই এ দেশের ব্যান্ড সংগীতের ইতিহাস নতুন করে লিখেছেন। জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘মাইলস’-এর মাধ্যমে বাংলা রক ও পপ গানে তারা যে বিপ্লব ঘটিয়েছেন, তার আদি পাঠ ও সুরের শুদ্ধতা ছিল বাবার কাছ থেকেই পাওয়া।
মাহমুদুন্নবী ও ফাহমিদা নবী-সামিনা চৌধুরী
বাংলা গানের সোনালী যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও কালজয়ী কণ্ঠশিল্পী মাহমুদুন্নবী। আমি সাত সাগর পাড়ি দিয়ে কেন সৈকতে পড়ে আছি', 'আয়নাতে ঐ মুখ দেখবে যখন' খ্যাত এই শিল্পীর উত্তারাধিকার বহন করে এ দেশের সংগীতাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন তার দুই সুযোগ্য কন্যা ফাহমিদা নবী ও সামিনা চৌধুরী। দুই বোনই আধুনিক ও চলচ্চিত্রের গানে নিজেদের শীর্ষস্থানে নিয়ে গেছেন, জয় করেছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও।
বিশ্ব সংগীত দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় সংগীতের শক্তির কথা। আর বাবা দিবস স্মরণ করিয়ে দেয় সেই মানুষগুলোর কথা, যাদের হাত ধরে জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয়। সংগীতাঙ্গনের এই বাবা-ছেলের গল্পগুলো তাই শুধু পারিবারিক সম্পর্কের নয়; এগুলো উত্তরাধিকার, প্রেরণা এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া সুরের গল্প। সময়ের সঙ্গে শিল্পী বদলান, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু একজন বাবার শেখানো সুর, একটি গিটার হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্ত কিংবা প্রথম গান শেখানোর স্মৃতি কখনো হারিয়ে যায় না।