মাগুরার মহম্মদপুর উপজেলার মনোয়ারা জামান কৃষি কলেজে হামলা, ভাঙচুর ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে সাবেক অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান লুলুর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খন্দকার মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানসহ চার-পাঁচজন শিক্ষক আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ঘটনাটি গত ২০ সেপ্টেম্বর কলেজ প্রাঙ্গণে ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। ঘটনার পর কলেজের বিভিন্ন কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া এবং পরদিন কলেজের মূল ফটকসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুরের অভিযোগও উঠেছে। এতে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, সাবেক অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান লুলু দীর্ঘদিন কলেজে অনুপস্থিত থাকার পর তৎকালীন অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও উপজেলা শিক্ষা অফিসার হোসনে মোবারকের স্বাক্ষরিত রেজুলেশনের মাধ্যমে খন্দকার মোহাম্মদ রোকনুজ্জামানকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষকদের অভিযোগ, ২০ সেপ্টেম্বর সাবেক অধ্যক্ষ লুলু কয়েকজন সহযোগীকে সঙ্গে নিয়ে কলেজে প্রবেশ করেন। এ সময় তার সঙ্গে বাবু, রিয়াজ, ফিরোজ, রউপ মোল্লা ও ইদ্রিসসহ কয়েকজন ছিলেন বলে তারা দাবি করেন।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খন্দকার মোহাম্মদ রোকনুজ্জামান বলেন, “সাবেক অধ্যক্ষ মশিউর রহমান লুলু কলেজে ঢুকেই আমাকে চেয়ার ছেড়ে দিতে এবং অধ্যক্ষের কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। আমি তখন চেয়ার ছেড়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে যাই। কিছুক্ষণ পর আমাকে ও কয়েকজন শিক্ষককে আবার অধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে বলেন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি তাকে জানাই, অ্যাডহক কমিটির রেজুলেশনের মাধ্যমে আমাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনিও যদি দায়িত্ব নিতে চান, তাহলে বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে নিয়ম অনুযায়ী রেজুলেশন করে দায়িত্ব বুঝে নিতে পারেন। এ কথা বলার পর তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। একপর্যায়ে ৬-৭ জন মিলে আমি সহ কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা ও মারধর করেন। পরে আমাদের কলেজ থেকে বের করে দিয়ে বিভিন্ন কক্ষে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।” এবং পরদিন কলেজের মূল ফটকসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়।
হামলার অভিযোগের শিকার শিক্ষক লিয়াকত আলী বলেন, “ঘটনার পর আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।”
এলাকাবাসীর দাবি, সাবেক অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান লুলু বিগত সরকারের আমলে তিনি প্রত্যক্ষ রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন এবং সাবেক এমপি সাইফুজ্জামান শেখরের কাছের লোক ছিলেন তাই নাম ভাঙয়েবি ব্যাপক দুর্নীতি করেছেন এবং জুলাই আন্দোলনে তৎকালীন সরকারের পক্ষে সক্রিয় আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এই মশিউর রহমান দুলুর নামে জুলাই হত্যা মামলা রয়েছে। ওই মামলায় তিনি দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন এবং বর্তমানে জামিনে রয়েছেন বলে তারা জানান।
তবে তাকে নিয়ে স্থানীয়দের আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর একাংশের দাবি, কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে তার নিয়োগের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারা অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এই কলেজে জবর দখল করে প্রিন্সিপাল হতে চেয়েছিলেন। একটি টেকনিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপাল হওয়ার কোনো যোগ্যতাই তার নেই।
হামলার শিকার শিক্ষকরা বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বেদবতী মিস্ত্রির কাছে লিখিতভাবে ঘটনার বিষয়টি অবহিত করেছেন। অভিযোগটি পাওয়ার পর তিনি মহম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মহম্মদপুর থানার ওসি বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে ফরওয়ার্ড করা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তাৎক্ষণিক একজন কর্মকর্তাকে বিষয়টি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে শিক্ষক-কর্মচারীদের অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক অধ্যক্ষ মো. মশিউর রহমান লুলু বলেন, “ওই কলেজটি আমার নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত কানাইনগর টেকনিক্যাল কলেজ নামে পরিচিত ছিল। বর্তমানে মনোয়ারা জামান কৃষি কলেজ নামে যে প্রতিষ্ঠানটি রয়েছে, সেটি তখনকার এমপি সাইফুজ্জামান শেখরের মায়ের নামে তৈরি এবং এর ক্যাম্পাস এটি নয়।” তাই“আমি ওই শিক্ষকদের বের করে দিয়ে তালা লাগিয়েছি।”
বর্তমান শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ কী হবে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “সেটা আমার জানার বিষয় নয়।”
কলেজে হামলা, ভাঙচুর ও তালা লাগানোর ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে। চলমান শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হবে, কলেজে নিয়মিত ক্লাস হবে কি না এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, একটি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এভাবে তালা ঝুলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিস্থিতি কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। দ্রুত বিরোধের নিরসন করে কলেজের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় জনগণ, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরাও বিষয়টির দ্রুত সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শাহ আমানত মিঠু
মহম্মদপুর (মাগুরা) প্রতিনিধি
